গাইবান্ধায় সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুকদের নিয়ে চলছে রমরমা প্রাইভেট বানিজ্য
✍ গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ
নীতিমালা লঙ্ঘন করে গাইবান্ধায় ভর্তি বানিজ্যে মেতে উঠেছে সরকারি উচ্চ বালক ও বালিকা বিদ্যালয়ের কতিপয় অসাধু শিক্ষকের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছুকদের ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এইসব সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
নীতিমালা লঙ্ঘন করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াচ্ছেন গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় ও গাইবান্ধা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ অন্যান্য উপজেলার সরকারি উচ্চ বালক ও বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শুধু তাই নয়, ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসব শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে মোটা অংকের অর্থ।
জেলা প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, ২০ ডিসেম্বর বাংলা, ইংরেজী ও গণিত বিষয়ের উপর ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ২৪০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হবে বিদ্যালয় দুটিতে। এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করে জেলা প্রশাসন ও এক বিদ্যালয়ের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারপর রাতে ফলাফল প্রকাশিত হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১০ জনের কথা বলা থাকলেও পড়ানো হচ্ছে সর্বোচ্চ ২০০ জন শিক্ষার্থীকে, তাদের তালিকা নিজের প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা জমা দেননি কোন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের পড়ানো বাবদ জেলাপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা এবং উপজেলা ও অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৫০ টাকা করে নেওয়ার কথা থাকলেও নেওয়া হচ্ছে দুই থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত।
জেলার অন্যান্য উপজেলার সরকারি উচ্চ বালক ও বালিকা বিদ্যালয় গুলোতেও একই অবস্থা।
গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক প্রাইভেট পড়াচ্ছেন তারা হলেন, সহকারি শিক্ষক এ কে এম আজাদ, আমিনুল ইসলাম, শাপুন মিয়া, নুর মোহাম্মদ হাবিবুল্লা, অজিত কুমার বর্মন, এ. বি. এম মোস্তফা কামাল, রেজাউল করিম, মোখলেছুর রহমান, মিজানুর রহমান, রফিকুল ইসলাম সরকার, শাহজাহান কবির, আলমগীর হোসেন, মাইদুল ইসলামসহ কয়েকজন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাইভেট বানিজ্য করছেন এ কে এম আজাদ। তিনি প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন।
এ ছাড়া গাইবান্ধা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক সাদাত রিয়াদ আরিফ, আব্দুর রউফ মন্ডল, খলিলুর রহমান, অনিল চন্দ্র সরকার, এস. এম আবু সাঈদ, রোস্তম আলী মন্ডল, মোস্তফা ফরহাদ, আবু বক্কর সিদ্দিক, ইসমাইল হোসেন, আতিকুর রহমান, শাহিন মন্ডলসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীদের।
এ কে এম আজাদ, মাইদুল ইসলাম, মোখলেছুর রহমান, সাদাত রিয়াদ আরিফসহ কয়েকজন শিক্ষক জানান, বিগত বছরগুলোতে তারা যেসব শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়েছেন তাদের প্রায় ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। আর এর কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, বিগত সালের পরীক্ষাগুলোতে তারা দেখেছেন কি ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। সেই ধারনা থেকে এখন শিক্ষার্থীদের পড়ান এসব শিক্ষকরা। গত ২৪ নভেম্বর শেষ হওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন শিক্ষকরা। এজন্য নেওয়া হচ্ছে দুই থেকে চার হাজার টাকা করে। এতে করে নীতিমালা লঙ্ঘন হচ্ছে না বলেও জানান এসব শিক্ষকরা।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী আফরোজা লুপু বলেন, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ শিক্ষকদের করা উচিত হবেনা। আর মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন প্রাইভেট পড়িয়ে চার হাজার টাকা করে নেয়াটাও অমানবিক।
প্রবীণ শিক্ষাবিদ মাজহার-উল-মান্নান বলেন, ভর্তি পরীক্ষার ঠিক আগে এই সময়ে প্রাইভেট পড়ানো মানে হচ্ছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে দেয়ার একটি নোংরা কৌশল। যাদের টাকা আছে তারাই প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আর তাই সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষার দৌড়ে পিছিয়ে পরছে। তিনি আরও বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলো যেহেতু প্রশাসন নিয়ে থাকে সুতরাং বিষয়টি যে তাদের জানা নেই- তা কিন্তু নয়। প্রশাসন নোটিশ দিয়ে এই প্রাইভেট পড়া বন্ধ করতে পারে।
গাইবান্ধা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জহুরুল হক বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়টি আমি জানি। কিন্তু এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।
গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিসেস সাহানা বানু বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের না পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের প্রতিবছরই নোটিশ দেওয়া হয়। তারপরও নিয়ম অমান্য করে তারা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন।
জেলা শিক্ষা অফিসার এনায়েত হোসেন বলেন, ভর্তির উদ্দেশ্যে প্রাইভেট পড়ানোর ফলে পরীক্ষাটা নিরপেক্ষ হবেনা। ১০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানোর কোন নিয়ম নেই। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে তদন্ত কমিটি গঠন করবো। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এসব বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আলমগীর কবির বলেন, পরীক্ষার আগে শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র তৈরির সাথে জড়িত না। তাই আমরা যে পদ্ধতিতে পরীক্ষার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবো তাতে করে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের কোন সুযোগ নেই। প্রকৃতই যারা মেধাবী তারা ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে। প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন ।



কোন মন্তব্য নেই