Header Ads

  • সংবাদ শিরোনাম

    ত্রাণ মানুষের আবদার নয় অধিকার



    ১৯৭২সালের ১৬ ডিসেম্বর  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ভাষণে সংবিধানের ৪টি মৌলিক স্তম্ভ- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র,সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।সেখানে তিনি বলেছিলেন সমাজতন্ত্রের মূল কথা হল বৈষম্যবিহীন সমাজ।যেখানে সকল নাগরিকের জন্য মৌলিক মানবাধিকার,সামাজিক,
    অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাম্য নিশ্চিত হবে। সেই ভাষণে তিনি আরও বলেছিলেন, আমাদের দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে সাম্যের কোটায় পৌঁছাবে যখন আমরা বাংলার মানুষকে ক্ষুধা,দারিদ্র্য,শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্ত করতে পারব।তৎকালীন প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বক্তব্যগুলো প্রদান করেন।তিনি মূলত চেয়েছিলেন বৈষম্যবিহীন সোনার বাংলাদেশ গড়তে যেখানে ধর্ম,বর্ন নির্বিশেষে সকলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে,মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে থাকবেনা কোন ভেদাভেদ। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমণ্ডির-৩২ এর বাসায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তার হত্যাকাণ্ডের পর কার্যত এদেশ ১০০বছর পিছিয়ে গেছে, পদে পদে মানুষের মৌলিক অধিকার খন্ডিত হচ্ছে।

    বিশ্বব্যাপী আজ ভয়াবহ করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বিরাজমান। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশেও আঘাত হেনেছে এই ভাইরাসটি। এই ভাইরাসের প্রকোপ রোধে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও চলছে অঘোষিত লকডাউন।সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এদেশের সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ। আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ রয়েছে গণপরিবহনও।ফলশ্রুতিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে এদশের লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী। উপার্জনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব শ্রমজীবীদের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ বিরাজ করছে। একবেলা খেয়ে ত আরেকবেলা না খেয়ে দিন পার করছে অগণিত অসহায় পরিবার।এসব লক্ষ লক্ষ অসহায় মানুষের ক্ষুধা নিবারণে সরকার পর্যাপ্ত পরিমান ত্রাণ সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছে।বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে অসহায়দের মাঝে নির্বিঘ্নে  ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে সরকারের কয়েকটি পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হল।
    ১.অগ্রাধিকার তালিকা করে ত্রাণ বিতরণঃ গত ২৯ মার্চ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরী করে ত্রাণ বিতরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, 'সারাদেশে করোনা ভাইরাসের কারণে শহর ও গ্রামে কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন অবস্থায় আছে।যেসকল কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে খাদ্য সমস্যায় আছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেসকল কর্মহীন লোক (যেমন-ভিক্ষুক,ভবঘুরে,দিন মজুর,রিক্সাচালক,ভ্যানগাড়ি চালক,পরিবহন শ্রমিক,রেস্টুরেন্ট শ্রমিক, ফেরীওয়ালা,চায়ের দোকানদার) যারা দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে সংসার চালায় তাদের তালিকা প্রস্তুত করে সহায়তা করার নির্দেশ দিয়েছেন। 

    ২.নিম্ন আয়ের মানুষসহ যারা লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতে সংকোচ বোধ করেন তাদের অগ্রাধিকার তালিকা করে ত্রাণ বিতরণঃ গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত ২এপ্রিল এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশে করোনা ভাইরাসের কারণে যেসকল কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে খাদ্য সমস্যায় আছেন আছেন সেসকল লোক (যেমন-ভাসমান মানুষ, প্রতিবন্ধী,বয়স্ক ব্যাক্তি,ভিক্ষুক,ভবঘুরে,
    রিক্সাচালক,ভ্যানগাড়ি চালক,পরিবহন শ্রমিক,ফেরীওয়ালা,চা শ্রমিক, চায়ের দোকানদার) যারা দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে সংসার চালায় তাদের তালিকা প্রস্তুত করে ত্রাণ বিতরণের নির্দেশ দিয়েছেন। 

    ৩. ত্রাণ উপকারভোগী ও প্রয়োজনীয় ত্রাণের পরিমান নির্ধারণের কমিটি গঠনঃ করোনা ভাইরাসের ফলে উউদ্ভূত পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট দুর্যোগে এপ্রিল হতে জুন ২০২০ পর্যন্ত ত্রাণ গ্রহণকারী উপকারভোগীর কথা সংখ্যা ও প্রয়োজনীয় ত্রাণের পরিমান নির্ধারণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে।
    অসহায়দের জন্য পর্যাপ্ত পরিমান খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য উপরিউক্ত পদক্ষেপেগুলোর পাশাপাশি সরকার বহুবিধ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। যা সময়োপযোগী প্রচেষ্টা হিসেবেই বিবেচিত।

    তবে মুদ্রার অপরপিঠের অবস্থা সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রম। সরকার থেকে প্রদত্ত ত্রাণসামগ্রী অসহায়দের হাতে পৌঁছানোর কথা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে।কিন্তু সেই জনপ্রতিনিধিরাই লাগাতার আত্মসাৎ করে যাচ্ছে অসহায় ও গরিবদের প্রাপ্য এসব ত্রাণসামগ্রী।সম্প্রতি গণমাধ্যমে উঠে আসা জনপ্রতিনিধিদের ত্রাণ লুটের কিছু ঘটনাও তুলে ধরা হল।

    ১. গত ৮ এপ্রিল নাটোরের সিংড়ায় চালসহ আওয়ামী লীগ নেতা ও এক চাল ব্যবসায়ীকে আটক করে উপজেলা প্রশাসন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন। একই দিনে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের ব্রহ্মগাছায় ৬৫ বস্তা চাল জব্দ করে পুলিশ। এসময় ডিলারের ছেলেসহ তিনজনকে আটক করা হয়। 
     ২.এর পূর্বের দিন (৭ এপ্রিল) এপ্রিল নাটোরের সিংড়াতেই উপজেলায় ১৩ বস্তা চালসহ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা শাহিন শাহ ও একজন ইউপি সহ তিনজনকে আটক করে উপজেলা প্রশাসন। তাদের বিরুদ্ধে সিংড়া থানায় মামলা  হয়েছে। 
     ৩. গত ৬ই এপ্রিল (সোমবার) ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. মনিরুজ্জামান মনিরের বাড়ি থেকে ৫০ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর থেকে মনির পলাতক রয়েছে। 
    ৪.৪ঠা এপ্রিল শনিবার যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় সরকারি গুদাম থেকে চুরি হওয়া ৫৫৫ বস্তা চাল উদ্ধার করে উপজেলা প্রশাসন। পৌর এলাকার বিজয়রামপুরের ভাই ভাই রাইস মিলের গুদাম থেকে এই চাল উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে মণিরামপুর থানার উপপরিদর্শক তপন কুমার সিংহ সাংবাদিকদের জানান, সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে ট্রাকে করে চাল পাচারের খবর পেয়ে এই চাল উদ্ধার করা হয়। সরকারি চাল মজুদ করায় চালকলের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আটক ও চাল পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকটি জব্দ করা হয়। 


    ৫. গত ৪ এপ্রিল বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নে ভিজিএফ চাল চুরির অভিযোগে চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন পল্টুকে আটক করে পুলিশ। চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন পল্টুর এলাকায় বরাদ্দকৃত ৪৪ মেট্রিকটন চালের মধ্যে সাড়ে ২৭ মেট্রিকটন চাল বিতরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কবির জানান। 

    ৬.একইভাবে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন পরিষদে ১৩ বস্তাা চাল চুরির অভিযোগ উঠেছে ইউপি চেয়ারম্যান এস এম রুপমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় একই ইউপি মহিলা সদস্য শাহনা বেগমকে মারধর করেছে চেয়ারম্যানের স্বজনরা। 

    ৭.গত ২এপ্রিল বৃহস্পতিবার নওগাঁর রাণীনগর এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি থেকে ৩৩৮ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। কালিগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ওই নেতার নাম আয়াত আলী। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল মামুনের নেতৃত্বে থানা পুলিশের সহায়তায় ওই চাল উদ্ধার করা হয়।
     ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাৎ এর অভিযোগে  এই পর্যন্ত প্রায় ২৫জন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

    দেশের এই ঘোর সংকটকালীন সময়ে জনপ্রতিনিধিদের মৌলিক দায়িত্ব ছিল প্রকৃত অসহায় ও গরিবদের মাঝে সরকার প্রদত্ত এসব ত্রাণসামগ্রী সুষ্ঠুভাবে বন্টন করে দেওয়া। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তারা নিজেরাই অসহায়দের প্রাপ্য জিনিস চুরিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে।  ধারাবাহিকভাবে ত্রাণ চুরির মাধ্যমে এটাকে রেওয়াজে পরিণত করেছেন সেইসব তথাকথিত জনপ্রতিনিধিরা।
    গত ৩১ মার্চ করোনার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন দুঃসময়ে কেউ সুযোগ নিলে কোন ছাড়া দেওয়া হবেনা। তবে আশাহত ব্যাপার হল প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর বার্তার পরও তথাকথিত সেই জনপ্রতিনিধিরা পুরোদমেই গরিব ও অসহায়দের প্রাপ্য ত্রাণ থেকে তাদের বঞ্চিত করেই চলছেন। তাদের লাগাম টেনে না ধরলে তা ক্রমশই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাবে যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এদেশের লক্ষ লক্ষ গরিব ও অসহায় মানুষ। তাই রাষ্ট্রের উচিত এখনই কঠোরভাবে ত্রাণ দুর্নীতির সাথে জড়িত সেইসব জনপ্রতিনিধিদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে।

    লেখকঃ অপূর্ব চৌধুরী
    শিক্ষার্থী_______________
    গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

    কোন মন্তব্য নেই

    Post Top Ad

    Post Bottom Ad