করোনায় সামাজিক দূরত্ব আশীর্বাদস্বরুপ
১৪শতকে পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল ব্ল্যাক ডেথ ভাইরাস।সর্বগ্রাসী এই ভাইরাসের কবলে পড়ে ১৩৪৬-১৩৫৩ সালের মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের প্রায় ২০০ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করে। পৃথিবী বিপর্যস্ত করা এই ব্ল্যাক ডেথ ভাইরাস নিয়ে ছিল বিভিন্ন বিতর্ক।একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করছিল এই ভাইরাসটি ছিল এক প্রকার গ্রন্থিপ্রদাহজনিত প্লেগ অন্য একটি সূত্র দাবি করেছিল এই মহামারী ঘটেছিল ইবোলা ভাইরাসের কারণে যার প্রধান
জীবাণুবাহী ছিল ইঁদুর।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যুগে যুগে বিভিন্ন মহামারী ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এই পৃথিবীতে ঘটেছিল।এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দ্যা এওইডেমিক অব ব্ল্যাক ডেথ প্লেগ (১৪২০),গুটিবসন্ত ও প্লেগ (১৫২০),দ্যা গ্রেট প্লেগ (১৭২০),দ্যা স্প্যানিশ ফ্লু (১৯২০) এর মত ভয়াবহ ভাইরাস।সময়ের পরিক্রমাতে এসব ভাইরাসের উৎস,উৎপত্তির কারণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক দিকসমূহ জানা যায়।
১০০বছর পূর্বে আঘাত হানা (১৯২০ সাল) দ্যা স্প্যানিশ ফ্লু ভাইরাসের পর জ্বরগ্রস্তের মত পৃথিবীতে বর্তমানে (২০২০ সাল) প্রাদুর্ভাব ঘটছে কোভিড-১৯ এর।সংক্রমণ সৃষ্টিকারী এই ভাইরাসটি হচ্ছে নোবেল করোনাভাইরাস।
২০২০ সালের শুরুতেই চীনের উহান শহর থেকে শুরু হওয়া প্রাণঘাতি নোবেল করোনাভাইরাসের তান্ডব চলছে বিশ্বব্যাপী। বিপর্যস্ত অন্যান্য দেশের মত অনুরূপ অবস্থা বিরাজ করছে বাংলাদেশেও। সারাদেশে চলছে লকডাউন। বন্ধ রয়েছে সকল সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ।থমকে গেছে অর্থনীতি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত অনুরূপ পরিস্থিতি বাংলাদেশে বিরাজ করলেও একটি মৌলিক জায়গায় পিছিয়ে আছে এদেশের মানুষজন। মহামারী করোনায় দিন দিন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়লেও সচেতনতা যেন থমকেই আছে এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের।অন্যান্য দেশের মানুষের সাথে এদেশের মানুষের মৌলিক পার্থক্যটাও এটাই। কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিকল্প না থাকলেও সেই সামাজিক দূরত্বকেই তোয়াক্কা করছেনা এদেশের অগণিত অসচেতন মানুষ।মাঠে-ঘাটে হাটে ও বাজারে অব্যাহত রেখেছে সমাগম।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে আশীর্বাদস্বরূপ সামাজিক দূরত্ব সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় রোগের সঞ্চালন ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য মানুষের সংস্পর্শে আসাকে কমানোর পদ্ধতিকে সামাজিক দূরত্ব বলে।সামাজিক দূরত্ব স্থাপনের মৌলিক উদ্দেশ্য হল সংক্রামক রোগ বহনকারীকে এড়িয়ে চলা এবং আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীর থেকে অন্যকারো মাঝে যেন সংক্রমণ না ছড়াতে পারে সেটা নিশ্চিত করা।যখন কোন রোগের সংক্রমণ দৈহিক সংস্পর্শ, যৌন সংস্পর্শ, হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে ছড়ায় তখনই সামাজিক দূরত্ব সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়।
২০০৯ সালে World Health Organisation (WHO) অন্যের হাত থেকে কমপক্ষে একহাত পরিমাণ দূরে থাকা ও সমাবেশ হ্রাস করাকেই সামাজিক দূরত্ব বলে অভিহিত করে।
শুরু থেকেই এদেশে করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালায়।যার অংশ হিসেবে গত ১৭ই মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের সকল জেলা,উপজেলা ও মফস্বল এলাকার মানুষদের সচেতন করতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে থাকে।পরবর্তীতে গণপরিবহনও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে শহর থেকে শুরু করে মফস্বল এলাকার হাট-বাজারসমূহ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উন্মুক্ত রেখে বাকি সময় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় স্থানীয় প্রশাসন। মরার উপর খড়ার ঘাঁ এর মত বিদেশ ফেরত প্রবাসীরাও তখন হোম কোয়ারান্টাইনে না থেকে স্বাধীনভাবে সব জায়গায় বিচরণ করতে থাকে।পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে যেতে থাকায় গত ২৩মার্চ উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাশাপাশি পুলিশ,র্যাব ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে সচেতন করার নানাবিধ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে মাত্র গুটিকয়েক মানুষ ব্যাতিত বাকিসবাই নিজেদের মর্জিমতই চলাচল অব্যাহত রেখেছ।
দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব না মেনে জনসাধারণের অবাধ বিচরণ ও তা দমনে স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতার কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলঃ
১. গত ১৩এপ্রিল দুপুরে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহীনুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভিযানে সামাজিক দূরত্ব না মানার অপরাধে বিভিন্ন উপজেলার মোট ৫৮জনকে ৬০হাজার ১৮০টাকা জরিমানা করা হয়েছে৷ এ ব্যাপারে অতি. ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহীনুজ্জামান বলেন,সরকারের নির্দেশনার অংশ হিসেবেই জনসমাগমরোধে এই অভিযান চালানো হয়েছে যা নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।
২.কুমিল্লায় গত ১৭মার্চ জনসাধারণের সমাগম রোধ ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য পুরোদমে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেই প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অবাধে বিচরণ করতে থাকে।অপরদিকে সামাজিক দূরত্ব না মানায় কুমিল্লায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯জন করোনায় আক্রান্ত হয়ছে। বাধ্য হয়ে গত ১০ এপ্রিল কুমিল্লাকে আনুষ্ঠানিক লকডাউন ঘোষণা করে খোদ জেলাপ্রশাসক।
৩. সামাজিক দূরত্ব না মানায় গত ২২ এপ্রিল বোয়ালমারী বাজারে রাজীব,জিয়াউর ও পরিতোষ কুমার নামে ৩ ব্যবসায়ীকে যথাক্রমে ২০হাজার,২০ হাজার ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
৪. গাজীপুরে অসচেতনতা ও সামাজিক দূরত্ব না মানার ফলে ভয়াবহ আকারে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। প্রশাসন কর্তৃক ঘোষিত লকডাউনকে উপেক্ষা করেই চলছে নির্মাণ কাজ ও চায়ের আড্ডা। করোনাভাইরাসের নতুন হটস্পট গাজীপুরে এই পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ২৭৯জন।আইইডিসিআরের তথ্যমতে এই জেলায় করোনা সংক্রমণের হার ২০%।
কার্যত এদেশের সামাজিক দূরত্ব উপেক্ষা করার বিষয়টি খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।ইতিমধ্যেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১২৭জনের মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে ৪২৮৬জন। তবে কি ভয়াবহতা বাড়লেও সচেতনতা বাড়বেনা? কবে থেকে এদেশের অসচেতন জঅসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলবে?
এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বলেছেন, সামাজিক দূরত্ব আরও ২বছর মেনে চলতে হবে।তারা সতর্ক করে বলেছেন ২০২৪ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের পাঁচ গবেষক গবেষণাটি করেছেন। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ গত মঙ্গলবার গবেষণা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক মহামারী পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০২২ সাল পর্যন্ত সামাজিক দূরত্বের নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। তবে নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেননি, ২০২২ সাল পর্যন্ত পুরো সময়টাই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে কি না। তবে তাঁরা বলেছেন, নতুন করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক বা চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনের আগপর্যন্ত সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে।
তাই এদেশের লক্ষ লক্ষ অসচেতন মানুষের সচেতন হওয়া এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে যেমন সুস্থ থাকা সম্ভব হবে পক্ষান্তরে সামাজিক দূরত্ব না মানলে অনাগত ভবিষ্যতেই বিপর্যস্ত হয়ে যাবে এই সোনার বাংলাদেশ।
লেখক - অপূর্ব চৌধুরী
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


কোন মন্তব্য নেই