মধ্যবিত্ত পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়ার কি কেউ নাই
স্টাফ রিপোর্টার, রাহাদ হোসেন / তিনদিন যাবত মনটা খুবই খারাপ ছিলো। কোন এক অজানা কষ্টের আর্তনাদ মনটা কুরেকুরে খাচ্ছিলো। ঘরে বসে ভাবছিলাম বর্তমান এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ বনশ্রী কিভাবে যাবো? আর যদি না যেতে পারি তাহলে পুরুষবিহীন একটি অসহায় পরিবারের আর্তনাদ হয়তো আরো বেড়ে যাবে। না খেয়ে হয়তো আরো কিছু দিন এভাবেই কাটাতে হবে।
আজ কয়েকদিন হয়ে গেলো পঞ্চাশোর্ধ এক ভদ্রমহিলা বারবার কল দিচ্ছিলো। বলছে বাবা আমাদের এলাকায় একটা দোকানও খুলছেনা। আমি তিন মেয়ে নিয়ে কোন রকম অাধপেট খেয়ে দিনাতিপাত করছি। সকালে রান্না হলে বিকালে করতে পারিনা। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়েছে যে দু কেজি চাল কেনার সামর্থ্য থাকা স্বত্ত্বেও কিনতে পারছিনা।
প্রতিদিনই অনেকে ত্রান দিতে আসে কিন্তু চক্ষু লজ্জায় কারো ত্রাণ আনতে যেতে পারিনা। এমন কষ্টকর পরিস্থিতিতে কারো কাছে কিছু চাইতেও ইতস্তত বোধ করছি। চিটাগাং থেকে বড় মেয়ে আপনার নাম্বারটা দিয়ে বললো যোগাযোগ করতে। আপনারা বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে সহযোগিতা করছেন। আমাদের এই বিপদে একটু পাশে দাড়ান, বাবা। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করবে।
কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ মনে পড়ে গেলো এই মহামারী পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তি প্রতিনিয়ত খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় রাতের বেলা নিরবে নিভৃতে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে পৌঁছে দিচ্ছেন। তিনি আর কেউ নন, নিউ ক্যাসেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পরিচালক খান মোজাম্মেল হক মিঠু। বিষয়টা আলোচনা করতেই মিঠু ভাই সাদরে আমন্ত্রন জানালেন।
সন্ধ্যার পর মিঠু ভাইয়ের সাথে তার গাড়িতে বেরিয়ে পরলাম। স্থানীয় আরো কিছু অসহায় মানুষের ফোন পেয়েছিলাম এবং তা মিঠু ভাইয়ের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের হাতে খাদ্যসামগ্রী পৌছে দিয়ে রাত আটটার সময় রওনা হলাম দক্ষিণ বনশ্রী। কিন্তু খিলগাঁও রেলক্রসিংয়ে পৌঁছে দেখি পুরো এলাকা লকডাউন। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে বাঁশের বেড়িকেড।
যাইহোক স্থানীয় ফার্মেসীর আর রিকসাওয়ালাদের থেকে জিজ্ঞেস করতে করতে বিভিন্ন অলিগলি ঘুড়ে প্রায় ২ ঘন্টা পর পৌছে গেলাম দক্ষিণ বনশ্রী। বনশ্রী এলাকাতে একই নামে দুটো রাস্তা। একটি চলে গেছে স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে অন্যটি নন্দীপাড়া ব্রীজের দিকে। কাংখিত লক্ষ্য আর খুজে পাচ্ছিলাম না। এতক্ষনে গাড়িতে সবাই হাপিয়ে উঠলাম। মনটাও মানছে না।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম মিঠু ভাই হয়তো বিরক্ত হচ্ছেন। ২৫/৩০ বার কল দিয়েও কাংখিত লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া গেলো না। অবশেষে নন্দীপাড়া ব্রীজের দিকে আবার রওনা হলাম কাংখিত লক্ষ্যে। একসময় প্রজেক্ট রাস্তা খজে বের করলাম। সেই রাস্তা ধরে এগোতেই বোরকা পরিহিত এক ভদ্রমহিলা গাড়ি দেখে হাত ইশারা দিচ্ছিলেন। সামনে এগিয়ে যেতেই মনে হলো ইনি হবেন।
আমাদের দেখে পঞ্চাশোর্ধ ভদ্রমহিলা হাফ ছেড়ে বাচলেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল খুবই সম্ভান্ত্র মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহকর্তী। যাই হোক খাদ্যসামগ্রীর দুটো ব্যাগ হাতে তুলে দিয়ে দোয়া চাইলাম। তিনিও মন থেকে দোয়া করলেন এবং পাশে থাকার আকুতি জানালেন। মনে মনে ভাবছিলাম যদি ওনার একটি ছেলে থাকলে আজ হয়তো এই পরিস্থিতিতে আমাদের মতোই মানবতার সেবায় বেরিয়ে পরতো।
গাড়ি উঠে আবার বাড়ি ফেরার জন্য রওনা দিলাম। গাড়ি উঠতেই মিঠু ভাই বললো ভাই এই কয়েকদিনে আমার গাড়ির দাম উশুল হয়ে গেছে। আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে অসহায় মানুষের দারে দারে যেতে পারছি। অন্তত তারা আমাদের জন্য দোয়াতো করবো।
আমি সমাজের সকল বিত্তবান শ্রেণীর মানুষের কাছে বিনীতভাবে আবেদন করছি, আপনারা আপনাদের আশেপাশের প্রতিবেশীর খবর নিন। নিজে খাওয়ার চেয়ে অন্যকে খাওয়ানোর মধ্যে কি আনন্দ একবার দেখুন। এই স্বাদটি একটু ভিন্ন, মনের মতো স্বাদ।
যাইহোক এই ছিলো আমাদের আজকের গল্প। আবার হয়তো অন্যকোন মানবতার সেবায় নিয়োজিত হয়ে নতুন কোন অসহায় মানুষের বাস্তব জীবনের গল্প নিয়ে হাজির হবো। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, বাসায় থাকুন। আল্লাহ হাফেজ।
মোহাম্মদ সাকোওয়াত হোসেন টিটু, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বৃক্ষছায়া ফাউন্ডেশন।


কোন মন্তব্য নেই